বাংলাদেশ সরকারের ব্যয়ের খাতসমূহ (১০.২)

নবম-দশম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - অর্থনীতি - বাংলাদেশ সরকারের অর্থব্যবস্থা | NCTB BOOK
6.7k
Summary

বাংলাদেশ একটি নিম্নমধ্যম আয়ের জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র, যা বছরে সরকারের বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করে। প্রধান ব্যয়ের খাতসমূহ হলো:

  • শিক্ষা ও প্রযুক্তি: প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, এবং উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ।
  • জাতীয় নিরাপত্তা: প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাজ-সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণে ব্যয়।
  • জনপ্রশাসন: সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অফিস পরিচালনা।
  • জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা: পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সেবা।
  • কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প: কৃষির উন্নয়ন ও গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ।
  • জনস্বাস্থ্য: হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন, চিকিৎসা সেবা।
  • সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ: ভাতা এবং বিভিন্ন সাহায্য কর্মসূচী।
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন।
  • পরিবহন ও যোগাযোগ: যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন।
  • দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণ।
  • ঋণ ও সুদ পরিশোধ: অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ।
  • শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা: শিল্পের উন্নয়নে ব্যয়।
  • পরিবেশ ও বন: পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম।
  • বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম: সংস্কৃতি ও ক্রীড়া উন্নয়নে ব্যয়।
  • স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন: স্থানীয় উন্নয়নের জন্য অর্থব্যয়।

সরকার ৫৫টি খাতে রাজস্ব এবং ১৮টি খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ব্যয় করে। উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয়ের বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হতে পারে।

বাংলাদেশ একটি নিম্নমধ্যম আয়ের জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, দেশ রক্ষা ও পরিচালনা এবং জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য প্রতিবছর সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করে । গণতন্ত্রের উন্মেষ ও উন্নয়নের ফলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে অনেক নতুন নতুন খাতও ব্যয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ।
বাংলাদেশ সরকারের ব্যয়ের প্রধান খাতসমূহ

১. শিক্ষা ও প্রযুক্তি
সরকার মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ ও গুণগত মান উন্নয়ন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা বিকাশে বৃত্তিসংখ্যা ও হার বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। শিক্ষার সাথে প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রতিবছর তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করে।
দেশকে বিদেশি শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম ক্রয়, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ, বেতন ভাতা, বাসস্থান ও চিকিৎসা প্রভৃতি প্রদানের জন্য সরকার এ খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এ খাতে অনেক ব্যয় বরাদ্দ অপ্রকাশিত থাকে।

৩. জনপ্রশাসন
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারকে জনপ্রশাসন পরিচালনা করতে হয়। প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অফিস পরিচালনা বাবদ সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৪. জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা
অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য আখা সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে ও পরিচালনা করতে এবং তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাবদ সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৫. কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কৃষি গবেষণা
বাংলাদেশ সরকার কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি এবং ঋণ বিতরণ করছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রথম কৃষি গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেওয়া শুরু করেছে।
৬. জনস্বাস্থ্য
জনগণের সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন, বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান, মহামারী প্রতিরোধ, ডাক্তার ও নার্সের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি খাতে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। চিকিৎসাসেবা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন এবং সেখানে একজন করে এম.বি.বি.এস ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েছে। যার ফলে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭. সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ
অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ সরকার সামর্থ্য অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচী, যেমন : বয়স্কভাতা কর্মসূচি, বিধবাভাতা, এসিডদগ্ধ নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানীভাতা, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে সৃষ্ট সাময়িক বেকারত্ব নিরসন, তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল এবং বাস্তুহারা গৃহায়ণ তহবিল, একশ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি, একটি বাড়ি একটি খামার এবং গরিব-দুস্থদের মাঝে রেশনিং কাজে সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে ।৮. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন বৃদ্ধিকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল গঠন প্রভৃতি খাতে প্রতিবছর সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৯. পরিবহন ও যোগাযোগ
বাংলাদেশের যাতায়াত, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকার যোগাযোগ, সড়ক, রেলপথ, নৌপরিবহন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে এবং সেতু বিভাগের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ।
১০. দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান
'ন্যাশনাল সার্ভিস' প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দুই বছরের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বল্প শিক্ষিত, কর্মঠ ও বেকার যুবকদের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে নানারূপ কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি (টিআর), খয়রাতি সাহায্য (জিআর), ভিজিএফ ও ভিজিডি বাবদ প্রতিবছর ১০ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য বিতরণ করছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করছে । এসব খাতে সরকারের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
১১. ঋণ ও সুদ পরিশোধ
সরকার দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস হতে প্রচুর পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করে। এসব ঋণ এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করতে সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।

১২. শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবাসমূহ
দেশের শিল্প এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন সেবা খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার এই ব্যয় করে থাকে । ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পুন-অর্থায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
১৩. পরিবেশ ও বন
পরিবেশ সংরক্ষণ-মানোন্নয়ন, শিল্পদূষণ থেকে রক্ষা, তরল বর্জ্য উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ইত্যাদি নানামুখী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য সরকার পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থ ব্যয় করে ।
১৪. বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম
সরকার দেশের তথ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং যুব ও ক্রীড়ার উন্নয়নে প্রতিবছর অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকে ।
১৫. স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন
স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয় ।
উল্লিখিত খাতগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার আরও কয়েকটি খাতে ব্যয় করে, যেমন- মহিলা ও শিশু, পানিসম্পদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, গৃহায়ণ, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার রাজস্ব বা অনুন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ প্রায় ৫৫টি খাতে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর প্রায় ১৮টি খাতে ব্যয় করে থাকে । আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্র ধারণার আলোকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে, অনুন্নয়নমূলক খাতে সরকারি ব্যয় হ্রাস করে উন্নয়নমূলক খাতে সরকারি ব্যয়ের পরিধি আরও প্রসারিত করা উচিত ।

Content added || updated By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...